একজন প্রোগ্রামারের মূল হাতিয়ার হলো তার মস্তিষ্ক। আর রমজানে রোজা রেখে সেই মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ ব্যবহার করাটা অনেকের কাছেই কঠিন মনে হয়। কিন্তু ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সময়ের ‘বরকত’ বা প্রাচুর্য এই মাসেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অফিস, ট্রাফিক আর ইবাদত সামলে একজন প্রোগ্রামার বা ডেভেলপার কীভাবে এই সময়টা বেস্ট ইউটিলাইজ করবেন, তার কিছু প্র্যাকটিক্যাল টিপস নিচে দেওয়া হলো :
১. নিয়ত বা ইনটেনশন ঠিক করা (Work is Worship)
ইসলামে হালাল রিজিকের সন্ধান করাও ইবাদত। আপনি যখন কোড করছেন বা বাগ ফিক্স করছেন আপনার পরিবারের রিজিকে সহায়তা করার জন্য, তখন সেটাও ইবাদতের অংশ। তাই কাজের সময়, ‘রোজা রেখে কাজ করতে পারছি না’।
এমন নেতিবাচক চিন্তা না করে নিয়ত ঠিক করুন যে, আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করছেন যা আল্লাহর নির্দেশ। এতে কাজের প্রতি ফোকাস বাড়বে এবং সওয়াবও পাওয়া যাবে।
২. ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা বরকতময় সময়ের ব্যবহার
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য ভোরের সময়টিতে বরকত দান করুন।”
বাংলাদেশের প্রোগ্রামাররা সাধারণত রাতজাগা পাখি (Night Owl) হয়। কিন্তু রমজানে এই রুটিনটা একটু শিফট করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
স্ট্র্যাটেজি: সাহরির পর ফজরের নামাজ পড়ে সাথে সাথে না ঘুমিয়ে ২-৩ ঘণ্টা ডিপ ওয়ার্ক (Deep Work) বা জটিল লজিক সলভ করার জন্য বেছে নিন। এ সময় পেট ভরা থাকে, ব্রেন ফ্রেশ থাকে এবং চারপাশ শান্ত থাকে। দিনের সবচেয়ে কঠিন কোডিং টাস্কটা এই সময়ে শেষ করুন।
৩. এনার্জি লেভেল অনুযায়ী কাজ ভাগ করা
সারাদিন আপনার এনার্জি লেভেল এক থাকে না। তাই কাজের ধরন বুঝে সময় ভাগ করে নিন:
- হাই ফোকাস টাইম (সকাল ৮টা – দুপুর ১২টা): নতুন ফিচার ডেভেলপমেন্ট, আর্কিটেকচার ডিজাইন বা লজিক্যাল সমস্যা সমাধান।
- লো ফোকাস টাইম (দুপুর ২টা – আসর): এ সময় গ্লুকোজ লেভেল কমে যায় এবং ঘুম পায়। এ সময় মিটিং, ডকুমেন্টেশন, ইমেইল চেক বা কোড রিফ্যাক্টরিং (ছোটখাটো ফিক্স) এর কাজগুলো রাখুন।
৪. ইফতার ও খাদ্যাভ্যাস: ভাজাপোড়া বনাম ব্রেন পাওয়ার
আমাদের দেশে ইফতার মানেই পেঁয়াজু, বেগুনি আর তেলের সমারোহ। একজন প্রোগ্রামার হিসেবে আপনাকে বুঝতে হবে, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা কার্বোহাইড্রেট (ভাত/বিরিয়ানি) খাওয়ার পর শরীর ‘সুগার ক্র্যাশ’ করে, ফলে তারাবihর সময় বা পরে আর কোড করার এনার্জি থাকে না।
- টিপস: ইফতারে খেজুর, প্রচুর পানি, ফল এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খান। পেট কিছুটা খালি রাখুন। এতে তারাবির নামাজে মনোযোগ থাকবে এবং নামাজের পর ১-২ ঘণ্টা ফ্রেশ মাইন্ডে কাজ বা পড়াশোনা করতে পারবেন।
৫. পোমোডোরো টেকনিক ও জিকির
একনাগাড়ে কাজ না করে ‘পোমোডোরো টেকনিক’ (২৫ মিনিট কাজ + ৫ মিনিট ব্রেক) ব্যবহার করুন।
- টিপস: ওই ৫ মিনিটের ব্রেফে গান না শুনে বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল না করে একটু হাঁটাহাঁটি করুন এবং জিকির (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ) বা ইস্তেগফার পড়ুন। এতে চোখ বিশ্রাম পাবে এবং আত্মিক প্রশান্তি আসবে যা কাজের স্ট্রেস কমাবে।
৬. সোশ্যাল মিডিয়া ডিটক্স
রমজানে আমাদের সবচেয়ে বেশি সময় নষ্ট হয় ইফতারের আগে বা পরে মোবাইল স্ক্রল করে। একজন প্রোগ্রামারের জন্য এই সময়টা অত্যন্ত দামী।
- চ্যালেঞ্জ: রমজানে ফেইসবুক/ইউটিউব বা অপ্রয়োজনীয় ব্রাউজিং বাদ দিন। ওই সময়টুকু কোরআন তিলাওয়াত বা ইসলামিক লেকচার শোনার কাজে লাগান। এমনকি ডিবাগিং বা ইউআই ডিজাইনের সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পারেন, এতে মনোযোগ বাড়ে।
৭. কমিউনিকেশন ও টিমওয়ার্ক
আপনি যদি রিমোট বা অফিসে টিমের সাথে কাজ করেন, তবে সততার সাথে কমিউনিকেট করুন। আপনার টিমকে জানান যে দুপুরের পর আপনার রেসপন্স কিছুটা ধীর হতে পারে। এটি অপেশাদারিত্ব নয়, বরং ট্রান্সপারেন্সি। সহকর্মীদের সাথে ভালো ব্যবহার করাও রোজার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
৮. রাতের রুটিন: তারাবির পর
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারাবির শেষ হতে হতে ৯:৩০-১০:০০টা বাজে। চেষ্টা করবেন এই টাইমে খাওয়া-দাওয়া করে খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার। যাতে করে আপনি সেহরির সময় উঠতে পারেন এবং এর পরে কাজ করতে পারেন।
মোটকথা, রমজান মাস কাজ বন্ধ রাখার মাস নয়, বরং শৃঙ্খলার মাস। কোডিং, বাগ ফিক্সিং আর মিটিংয়ের ভিড়েও আল্লাহর সাথে কানেকশন তৈরি করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন একটু ডিসিপ্লিন, সঠিক খাবার এবং সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা।

